মাধ্যমিকের পর কর্মমুখী শিক্ষা


মাত্র ক’দিন আগেই শেষ হলো এসএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে কিছুদিন পর। আর এর পরই শুরু হবে ভর্তি যুদ্ধ। পরীক্ষার্থীরা অনেকেই ভেবে পাচ্ছে না কোথায় ভর্তি হলে কেমন হবে, কোথায় ভর্তিতে কেমন যোগ্যতা প্রয়োজন। আবার অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কোথায় ভর্তি হলে ক্যারিয়ার নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হবে না। এবারের ফিচার এসব বিষয় নিয়েই। লিখেছেন মাহবুব শরীফ

শাহ আলম মজুমদার

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন বিভাগের বিশেষজ্ঞ

মাধ্যমিকের পর কোথায় ভর্তি হবে, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই আছে দোটানা। তাদের জন্য কারিগরি শিক্ষাই একটি উত্তম পন্থা। ভর্তির বিষয়ে নিতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। তা না হলে এর খেসারত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম একটি ধারা হচ্ছে কারিগরি শিক্ষা। কর্মদক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে পৃথিবীর সব দেশেই কারিগরি শিক্ষার উপর যথেষ্ট জোর দেয়া হয়। একটু দেরিতে হলেও আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দেশে রয়েছে কারিগরি শিক্ষার অনেক প্রতিষ্ঠান। এসএসসি’র পর পরই এসব কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ মেলে।

বাংলাদেশে বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট রয়েছে। এদের মধ্যে সরকারি ৪১টি, ভোকেশনাল ইন্সটিটিউট ৯০টি, গ্লাস ও সিরামিক ইন্সটিটিউট ১টি যা ঢাকায় অবস্থিত, টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট ২৪টি ও সার্ভে ইন্সটিটিউট ২টি। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তো রয়েছেই। যারা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা শেষ করবে তাদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ রয়েছে ঢাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)-এ। কারণ এ বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত। অন্যদেরও দেশে-বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ রয়েছে।

৩ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্স শুধু চট্টগ্রামের বন মহাবিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। এখানে আসন সংখ্যা ৫০। ফরেস্ট্রি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করার পর বাংলাদেশ বন বিভাগের শূন্যপদে ফরেস্টার/বিট অফিসার হিসেবে চাকরির সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওতে চাকরির সুযোগ রয়েছে।

দেশে পাট গবেষণার উপর ডিপ্লোমা প্রদানকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান টাঙ্গাইল টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট। এখানে পাট গবেষণার ওপর রয়েছে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স। পাটজাত বিভিন্ন দ্রব্য তৈরি করে দেশে বর্তমানে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। কিন্তু সে তুলনায় পাওয়া যাচ্ছে না দক্ষ জুট ইঞ্জিনিয়ার।  আবেদনপত্র জমা দেয়ার পর সর্বোচ্চ জিপিএর ভিত্তিতে প্রতি ব্যাচে ৫০ জনকে ভর্তি করা হয়। ডিপ্লোমা ইন জুট টেকনোলজি কোর্স সম্পন্ন করার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাকরির সুযোগ আছে। এ ছাড়া ভালো বেতনে দেশের যেকোনো জুট মিলে চাকরির সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে এ কোর্সের বেশ চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে রয়েছে একটি ফরেস্ট্রি ইনস্টিটিউট।

তিন বছর মেয়াদী এই কোর্স বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধিভুক্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৯টি। যেগুলো ছড়িয়ে আছে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেসব বিষয় পড়ানো হয় সেগুলো হলো- ডেন্টাল, পেসেন্ট কেয়ার, ফিজিওথেরাপি, ফার্মা, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং, ইন্টিগ্রেটেড ও ল্যাবরেটরি টেকনোলজি।

ভর্তির যোগ্যতা

এসএসসিতে সাধারণ গণিত বা উচ্চতর গণিতে গ্রেড পয়েন্ট ২ সহ (অথবা ৪০ শতাংশ নম্বর) কমপক্ষে জিপিএ-২ (অথবা দ্বিতীয় বিভাগ)। উল্লেখ্য, এখানে যেকোনো বর্ষে পাস করা শিক্ষার্থী আবেদন করতে পারবে।

এই বিষয়ে কথা বলা হয়ে ছিল বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন বিভাগের বিশেষজ্ঞ শাহ আলম মজুমদারের সাথে। বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলাপচারিতায়  বিভিন্ন তথ্য দেন তিনি। কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে তার কাছে জানতে জানতে চাইলে  তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সবাই বিস্মিত এবং আমরা চিন্তিত। ইউরোপসহ সব দেশের জনসংখ্যা যেখানে কমছে সেখানে আমাদের জনসংখ্যা বাড়ছে। এ সব দেশে বয়স্কদের সংখ্যা বাড়ছে এবং আমাদের দেশে কর্মক্ষমদের সংখ্যা বাড়ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, ২০৩০ সালে আমাদের জনসংখ্যা হবে ১৮ কোটি, তার মধ্যে ১২ কোটি হবে কর্মক্ষম। এই বড় অংকের জনসংখ্যা যদি বৃত্তিমূলক শিক্ষা অর্জন না করে তবে দেশে ও দেশের বাইরে কাজের সুযোগ হওয়া কঠিন হবে। ফিলিপাইনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের পরিবর্তনের পেছনে কারিগরি শিক্ষাই প্রধান হিসেবে কাজ করছে। জার্মানিতে টেকনিক্যাল শিক্ষার হার ৬৪ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়াতে প্রায় ৭০ শতাংশ, মালয়েশিয়াতে ৪০ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়াতে প্রায় ৬৫ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে প্রায় ৭০ শতাংশ। আমরা যদি খেয়াল করি দেখতে পারব যে দেশ খুব দ্রুত ডেভেলপ করেছে তাদের সবারই কারিগরি শিক্ষার হার বেশি।

আমাদের দেশে টেকনিক্যাল গ্রাজুুয়েটদের চাকরিতে মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, পলিটেকনিক থেকে গ্র্যাজুয়েটরা দশম গ্রেডে চাকরি পায় অথচ জেনারেল থেকে এই চাকরি পেতে হলে তাকে বিসিএস করতে হয়। টেকনিক্যাল ডিগ্রি অর্জন যতটা সহজ বিসিএস করাটা তত সহজ না। ১২ কোটি মানুষকে কর্মক্ষম করে তুলতে কারিগরির বিকল্প নেই।

দেশের বাইরে চাকরির ক্ষেত্রে কারিগরি ডিগ্রি প্রাপ্তদের প্রসঙ্গে তিনি জানান, আমাদের সাধারণ শিক্ষায় বিএ পাশ করে যে ধরনের চাকরি পাচ্ছে, তার চেয়ে ভালো চাকরি পাচ্ছে ডিপ্লোমা করে। জেনারেল শিক্ষা নিয়ে কেউ বিদেশে গেলে কম বেতনে বা সস্তার চাকরি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল শিক্ষা নিয়ে গেলে এই ধরনের ঝামেলায় পড়তে হবে না।

ভর্তিতে মানবন্টন

বিজ্ঞানে (পদার্থ +রসায়ন) ১৫, সাধারণ জ্ঞানে ৬, গণিতে ১৫, ইংরেজিতে ৭ ও বাংলায় ৭। সব মিলিয়ে মোট ৫০ নম্বরে পরীক্ষা হয়।

ভর্তিতে আসন বন্টন

মহিলা-২০%, এসএসসি (ভোকেশনাল) ১৫%, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আবেদনকারীদের ঢাকা, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ-সুইডেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রতিটিতে ৪টি করে ও অন্যান্য পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ২টি করে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের প্রতি টেকনোলজিতে প্রতি গ্রুপে ২টি করে, প্রতিবন্ধী ৫% এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও অধিদপ্তরাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক/কর্মকর্তা/কর্মচারীর সন্তানদের জন্য ২% আসনে মেধা ও আবেদন ফরমে বর্ণিত পছন্দের ভিত্তিতে কোটা সংরক্ষণ করে ভর্তি করা হবে। এসএসসিসহ বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত ০২ (দুই) বছর মেয়াদী ট্রেড কোর্স পাস প্রার্থীদের ট্রেড কোর্সে প্রাপ্ত নম্বরের ও এসএসসি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে মেধা নির্ধারণ করা হবে এবং তাদেরকে ৫% সংরক্ষিত আসনে ভর্তি করা হবে।